টাঙ্গাইলের গোড়াই-সখিপুর সড়কের মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদীর হাটুভাঙ্গা এলাকায় নির্মিত হাটুভাঙ্গা ব্রিজে দীর্ঘদিন ধরে ইজারা দিয়ে চলছে টোল আদায়। নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে বেশি টাকা আদায় হলেও বন্ধ হচ্ছে না এই টোল আদায়।২০০১ সাল থেকে ২০১৮-১৯ অর্থ বছর পর্যন্ত সরকার ব্রিজটি ইজারা দিয়ে ৯ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সড়কটি দিয়ে চলাচলরত যানবাহনের চালক, হেলপার ও স্থানীয় লোকজন টোল আদায় বন্ধের দাবি করে আসছেন।

জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের আজগানা, লতিফপুর, বাঁশতৈল ও তরফপুর ইউনিয়ন এবং ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রোকোনার কয়েক লাখ মানুষকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে ফেরি ও ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় হাটুভাঙ্গা এলাকার বংশাই নদী পার হতে হতো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে স্থানীয় লোকজনের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে বংশাই নদীর ওই স্থানে ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যায়ে ব্রিজটি নির্মাণ কাজ পায় ঢাকার মনিকো এন্টারপ্রাইজ। বাংলাদেশ ও জার্মান সরকারের যৌথ উদ্যোগে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রিজটি ২০০১ সালে নির্মাণ কাজ শেষ করে। ব্রিজটি চালু হওয়ার পর মির্জাপুরের পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মানুষ গোড়াই-সখিপুর সড়ক হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত বেড়ে যায়।
বর্তমানে এ সড়কটি ব্যস্ততম সড়কে রুপ নিয়েছে। প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করছে এই সড়ক দিয়ে।
ব্রিজটি নির্মাণের পর থেকেই সরকার সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাধ্যমে টোল আদায়ের জন্য ইজারা পদ্ধতি চালু করে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে টোল আদায়ে ব্রিজটি ২৮ লাখ ৩২ হাজার ১৫০ টাকায় প্রথম ইজারা নেন আজাগানা ইউনিয়নের হাটুভাঙ্গা এলাকার শামসুল আলম নামে এক ঠিকাদার। ২০০৩/০৪ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০, ২০০৪/০৫ অর্থবছরে ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকায় একই ঠিকাদার ব্রিজটি ইজারা নেন। ২০০৫/০৬ অর্থ বছরে হাটুভাঙ্গা এলাকার আতিকুল ইসলাম শিকদার নামে এক ঠিকাদার ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ব্রিজটি ইজারা নেন। পরবর্তীতে ২০০৬/০৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৮০ হাজার, ২০০৮/০৯ অর্থবছরে ৫৪ লাখ ৬০ হাজার, ২০০৯/১০ অর্থ বছরে ৬৩ লাখ ৭০ হাজার, ২০১০/১১ অর্থবছরে ৭৬ লাখ ৪৪ হাজার, ২০১১/১২ অর্থবছরে ৬৮ লাখ ৪০ হাজার, ২০১২/১৩ অর্থবছরে ৬৯ লাখ ৮ হাজার ৬০০, ২০১৩/১৪ অর্থবছরে ৭২ লাখ ৫০ হাজার, ২০১৪/১৫ অর্থবছরে ৬৪ লাখ ৬০ হাজার, ২০১৫/১৬ অর্থবছরে ৬৭ লাখ ৫৬ হাজার, ২০১৬/১৭ অর্থবছরে ৭১ লাখ ৮৪ হাজার এবং ৬ মে ২০১৮ হতে ৭৮৫ দিনের জন্য ১ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় আতিকুল ইসলাম শিকদার নামে একই ব্যক্তি ইজারা নিয়ে টোল আদায় করছেন।শ্রেণি ভেদ প্রতি পাড় ট্রেইলার ১২৫ টাকা, হেভী ট্রাক ১০০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ৫০ টাকা, বড় বাস ৪৫ টাকা, মিনি ট্রাক ৪০ টাকা, কৃষি কাজে ব্যবহৃত যান প্রতি পাড় ৩০ টাকা, মিনি বাস ২৫ টাকা, মাইক্রো/ফোর হুইল চলিত যান ২০ টাকা, সিডান কার ১৫ টাকা ও ৩ চাকার যান/মোটরসাইকেল ৫ টাকা করে টোল আদায় করছেন। সম্প্রতি সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পার্শ্ববর্তী সখিপুর উপজেলায় দলীয় সমাবেশে যাওয়ার পথে হাটুভাঙ্গা ব্রিজ এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যানবাহনের শ্রমিক ও স্থানীয় জনতা ব্রিজটির টোল আদায় বন্ধ করার দাবি জানান। তিনি ওইসময় বলেছিলেন এ বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় দেখেন। অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলে বিষয়টি সুরাহা করার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন বলে মো. সিদ্দিক মোল্লা, নাজিম উদ্দিন মোল্লা, লাল মিয়াসহ স্থানীয় লোকজন জানান।
মির্জাপুরের পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের কৃষকের উৎপাদিত ফসল ও কৃষি পণ্য এই ব্রিজ দিয়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে নিতে হয়। এই টোল আদায়ের কারণে কৃষকের কৃষি পণ্য বহনে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
অপরদিকে পাহাড়ি অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হলেও এখানে যানবাহনের টোল গুনতে হয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। বাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণ করতে মালিকদের খরচ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
টাঙ্গাইল থেকে সখিপুরগামী বাসের চালক মোস্তফা মিয়া ও বাসের হেলপার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি পারে ৪৫ টাকা করে টোল দিতে হয়।
ইট ভতি ট্রাকের চালক ইউনুস মিয়া জানান, প্রতি পারে ১০০ টাকা করে টোল দিতে হয়। দিনে তাকে প্রায় ৫/৬ বার পার হতে হয়। এছাড়া ব্রিজটির আশপাশে কমপক্ষে ২০/২৫টি ইট ভাটা রয়েছে। ওইসব ভাটার ইট বিভিন্ন স্থানে পৌছে দিতে প্রায় হাজার খানেক ট্রাক ব্রিজটি পার হতে হয়। এতে ইটের ক্রেতাদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
পিকআপের চালক (ঢাকা মেট্রো-১৮-৫০৩১) মো. শরিফুল ইসলাম, কাঠ ভর্তি টমটম চালক, হাকিম মিয়া ও লাল মিয়া জানান, তাদরে প্রতি পারে ৪০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। যানবাহনের চালকরা টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, টোল আদায় বন্ধ হলে আমরা কম টাকায় মালামাল বহন করতে পারবো। এতে আমাদের খরচও কমে যাবে। স্থানীয় লোকজনও ব্রিজটিতে টোল আদায় বন্ধের দাবি করেছেন।
আজগানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম শিকদার, বাঁশতৈল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান মিল্টন ও তরফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন জানান, তাদের এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার কৃষকের কৃষি পণ্য বহনে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। এছাড়া মির্জাপুরের পাহাড়ি এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার রোগী চিকিৎসা নিতে ঢাকা ও মির্জাপুর সদরের যাওয়ার পথে ব্রিজটিতে টোল দিয়ে যেতে হয়। জনগুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজটিতে টোল আদায় বন্ধে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তারা।
হাটুভাঙ্গা ব্রিজের টোল আদায় ইজারাদার মো. আতিকুল ইসলাম শিকদারও সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সরকারের কাছে ব্রিজটি ইজারা বন্ধের দাবি জানান।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল এহসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সরকার ব্রিজের টোল আদায়কে দেশের আয়ের পথ হিসেবে নিয়েছে। তাছড়া যেসব ব্রিজ ইজারা দেয়া হয়েছে ওইসব ব্রিজ ইজারা বন্ধ করনে সরকারের পরিকল্পনা নেই। তবে নতুন অর্থমন্ত্রী নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করলে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্রঃ কালের কন্ঠ।

