সখীপুরে বাড়ি বাড়ি ঋণদাতা, ঋণের চাপে বাড়ছে অপরাধ

0
108

সাইফুল ইসলাম সানি: টাঙ্গাইলের সখীপুরে বাড়ি বাড়ি গড়ে ওঠেছে ঋণদাতা। অপরাধ বৃদ্ধিতে নীরবে-নিভৃতে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ ভূমিকা পালন করছে এসব উচ্চ সুদের ঋণ ব্যবস্থা। গ্রামের মুদি দোকানদার, ভ্যানচালক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ‌ দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিরবে ঋণের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে। ঋণগ্রস্তরা এসব ঋণের চাপে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা ও নির্মম অপরাধের পথও বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের সখীপুরের তিনটি খুনের ঘটনা বিশ্লেষণে এমন ভয়াবহ তথ্যই ওঠে এসেছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার দাড়িয়াপুর উত্তরপাড়া গ্রামের রুপা-রঞ্জু দম্পতির মেয়ে সামিয়া (৯) প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে অপহরণ হয়। দুইদিন পর (৮ সেপ্টেম্বর) বাড়ির অদূরে বনের পাশে সামিয়ার লাশ পাওয়া যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকটি ইউনিট দীর্ঘ ২১দিন পর ঘটনার মূল হোতা সাব্বির হোসেন (২১) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাব্বির পুলিশের কাছে শিশু সামিয়া হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তবে খুনের মূল কারণ জানিয়েছেন ঋণের চাপ ও প্রকাশ্যে অপমান। মাত্র ৬৫ হাজার টাকা ঋণের চাপে সাব্বির অপহরণের সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে গত ১৯ জুলাই রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজেলার হামিদপুর চৌরাস্তা বাজারের ব্যবসায়ী শাহজালাল (৩৫) ও তাঁর প্রতিবেশী চাচা মজনু মিয়া (৫০) মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে কাকড়াজান ইউনিয়নের বাঘেরবাড়ি বাংলাবাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁদের কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার ১৫ দিন পর ৩ আগস্ট রাতে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মোস্তফা কামাল (২৩) ও তাঁর সহযোগী আলামিনকে (২৪) গ্রেপ্তার করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়— ঋণের চাপে প্রথমে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ছিল মোস্তাফার। রাজমিস্ত্রী মোস্তফা স্থানীয় সমিতি থেকে বেশ কিছু টাকা ঋণ নিয়েছেন। সম্প্রতি সমিতি থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যাপকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। ওই ঋণের টাকা পরিশোধ করতেই তিনি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। পরে এ পরিকল্পনায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেন সহযোগী আলামিন। এ ছাড়া গত বছরের ২৬ অক্টোবর উপজেলার লাঙ্গুলিয়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আলী আজম (৪০) ঋণের চাপে নিজের দোকানেই আত্মহত্যা করেন। এভাবে ঋণের চাপে আত্মহত্যা ও অপরাধ প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সখীপুরে দেশের প্রতিষ্ঠিত এনজিও সংস্থাগুলো ছাড়াও উপজেলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠেছে ক্ষুদ্র ঋণদাতা সমিতি-সংগঠন। কেউ কেউ এককভাবেই নিজ নিজ এলাকায় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মীরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনকে ঋণ নিতে প্রভাবিত করেন। অনেকে এক সমিতির কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে অন্য সমিতি থেকেও ঋণ নিচ্ছেন। আর এভাবেই দিনদিন ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে ঋণ গ্রহীতাদের। অন্যদিকে সময়মত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারলেই স্ত্রী-পরিবার এমনকি বাজার ঘাটে প্রকাশ্যে অপদস্থ হচ্ছেন ঋণগ্রস্তরা। ফলে এদের মধ্যে কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
ঋণদাতা এসব ব্যক্তি ও সমিতির সঠিক হিসাব নেই কারও কাছেই। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে উপজেলা ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থাগুলোর মালিকেরা “সখীপুর উপজেলা এনজিও মালিক সমিতি” নামের একটি সংগঠন করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে ওই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩১টি সংগঠন মালিক। কিন্তু করোনাকালীন সময় থেকে সংগঠনটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ওই সংগঠনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এ প্রতিবেদককে বলেন, সমিতিগুলোর ঋণ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য থাকে ঋণগ্রহীতাকে স্বাবলম্বী করা। কিন্তু তারা যে ব্যবসার কথা বলে ঋণ নেয়, টাকাগুলো সেই কাজে ব্যবহার করেনা। অনেকে তথ্য গোপন করে একাধিক সংস্থার কাছ থেকেও টাকা নিয়ে ঋণের বেড়াজালে আটকে পড়েছে।

উপজেলা সমবায় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সখীপুরে তাঁদের নিবন্ধিত সমবায় সমিতি ২৩৩টি। তবে সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক বাহারুল ইসলাম জানান, আমাদের এই তালিকার বাইরে নিবন্ধন ছাড়াই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো সুদহার বসিয়ে ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ বিষয়ে সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তি ঋণের বেড়াজালে আটকা পড়লে তাঁর করণীয় কী, এ বেড়াজাল থেকে কীভাবে বের হয়ে আসতে হবে, এসব মানসিক সহায়তা দেওয়ার কোনো সুব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া থাকে সামাজিক লোকলজ্জার চাপ। এসব চাপ সামাল দিতে না পেরে ঋণগ্রস্তরা সহজ উপায় হিসেবে অপরাধের পথ বেছে নেয়। এদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে ওঠা ঋণদাতা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারির মধ্যে আনাও প্রয়োজন।

বার্তা ডেস্ক