সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা

0
188

সাইফুল ইসলাম সানি: দেশের গ্রামীণ, স্থানীয় বা মফস্বল সাংবাদিকতায় হুমকি ধামকি হামলা মামলা নির্যাতন একটি বহুল পরিচিত বিষয়। সাংবাদিকদের কোনো বন্ধু থাকে না এ কথাটিও অধিকাংশে সত্য। সংবাদ কোনো দল মত বা ব্যক্তির পক্ষে গেলে ভালো, কিন্তু বিপক্ষে গেলেই সাংবাদিক হয়ে যায় সাংঘাতিক। সমাজের দুর্নীতিবাজদের বাইরেও সাংবাদিকদের বড় শত্রু হয় সহকর্মী সাংবাদিকরাই। বিশেষ করে স্থানীয় প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি অথবা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে যত বিভেদ ও শত্রুতা।

বর্তমা‌নে শুধু মফস্বল সাংবাদিকতা নয়, পুরো পেশাটি নিয়েই অনেকে উষ্মা প্রকাশ করে থাকেন। সাংবাদিকতা আজ আর তার সঠিক জায়গায় নেই, এ বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত। নিজের পেশা নিয়ে যখন কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করে; তখন খারাপ লাগে। তবুও বলতে হচ্ছে— হাসির ছলে হলেও আজকাল সাংবাদিকদের নানারকম বিদ্রুপাত্মক শব্দ দিয়েই বেশি সম্বোধন করতে শোনা যায়। কঠিন হলেও সত্য, সাংবাদিকতার এমন অবস্থা তৈরির পেছনে খোদ সাংবাদিক নেতারাই দায়ী। পথে-ঘাটে রাস্তায় অশিক্ষিত কুশিক্ষিত সাংবাদিকদের আনাগোনায় মানুষ অনেকটা বিরক্ত। কুশিক্ষিত শব্দটি ব্যবহার করেছি তাদের জন্য, যাদের প্রতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট থাকলেও নৈতিক পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার ব্যাপক অভাব রয়েছে। সাংবাদিক নেতারা কেউ নিজের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে, আবার কেউ কেউ নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারা দেশেই এসব নিরবচ্ছিন্নভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এই কথাও সত্য যে, সমাজের বিত্তবানের চেহারায় মুখোশ পড়া চোর দলের সদস্যরাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বেশি অপপ্রচার চালান। গুটিকয়েক সাংবাদিক অশিক্ষিত কুশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত যাই হোক, তাঁরা সমাজের ওই মুখোশধারী চোরদেরকেই বেশি বিরক্ত করে। দেশের ভদ্র একটি শ্রেণির জন্য সংবাদপত্র এবং সাংবাদিক এখনো সমাজের দর্পণ হিসেবেই অক্ষুন্ন ভূমিকায় রয়েছে বলে মনে করি।

অনেকেই বিষয়টি জানেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করে সংবাদকর্মীদের সংসার চলেনা। এ কারণে মফস্বলের সাংবাদিকেরা বিকল্প কোনো চাকরি বা ব্যবসা করেন। এখানে উল্লেখ করা বিশেষভাবে প্রয়োজন, যিনি এই দ্বৈত পেশায় নিযুক্ত, তিনি সাংবাদিকতার বাইরে যতো বড় অথবা সম্মানী চাকরিই করুক না কেন; নিজেকে সাংবাদিক হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করেন।
একদিকে সাংবাদিকতা এখন গর্ববোধের জায়গায় নেই, অন্যদিকে দ্বৈত পেশার মধ্যে তিরস্কারমূলক সাংবাদিকতা পেশার পরিচয় দিতেই মানুষ বেশি পছন্দ করছে। এর মূল কারণ হচ্ছে সাংবাদিকতায় স্থানীয়ভাবে পাওয়ার অ্যাপ্লাই (ক্ষমতা প্রয়োগ) করা যায়। আর এটিই বর্তমান মফস্বল সাংবাদিকতার মূল সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, বর্তমানে সম্মান নয়; শুধুমাত্র ক্ষমতা প্রয়োগের এই লোভ থেকেই ‌ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ছোটখাটো চাকরিজীবী এমনকি সাংবাদিকতার চাইতে বেশি সম্মানীয় পেশায় নিযুক্তরাও এ পেশায় যুক্ত হতে উঠে-পড়ে লেগেছেন।
কেউ সরাসরি বড় পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক হতে না পারলে নিজেরাই খুলে বসছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল অথবা ইউটিউব চ্যানেল। এই সুযোগে সমাজের কিছু অশিক্ষিত কুশিক্ষিত পাতিনেতাদের গলায় ঝুলছে সংবাদপত্রের আইডি কার্ড, হাতে ওঠছে ইউটিউব চ্যানেলের বুম। তারা চষে বেড়াচ্ছে পথ ঘাট মাঠ প্রান্তর। এদের মধ্যে কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে হঠাৎ জনপ্রিয়তাও পেয়ে যাচ্ছেন। তবে সর্বোপরি ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছেন সাংবাদিকতার মতো মহান এ পেশাটির। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই হচ্ছে প্রকৃত মফস্বল সাংবাদিকদের মূল অসুবিধা।

যারা হঠাৎ জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় সাংবাদিক হতে চান, তাদের মনে রাখা উচিত— সাংবাদিকতায় প্রকৃত সুনাম জোশ খ্যাতি একদিনে আসে না, এটি একটি ধীর ও পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া। মানুষ দেখেন, পড়েন তারপর ধীরে ধীরে বিচার বিশ্লেষণ করে রায় দেন।
এ ছাড়া আরও জেনে রাখা প্রয়োজন যে, অর্থ নয় কাজের প্রতি অনুরাগই প্রকৃত মফস্বল সাংবাদিকদের মূল চালিকা শক্তি। যদি এটি অর্থ উপার্জনের জন্য হতো, তবে তাঁরা এই পেশায় থাকতো না। তাঁরা তাদের পরিশ্রমের হিসেবে কখনোই ততোটা উপার্জন করেনা, তবে তাঁরা সময়কে বিনামূল্যে ব্যাপকভাবে উপভোগ করেন।

আশার কথা এই যে, কিছু সুনাগরিক ও পাঠকের প্রত্যাশা এখনো মরে যায়নি। তাঁরা আশা করেন— সমাজের সবচেয়ে বুদ্ধিমান, চতুর, সাহসী, শিক্ষিত ও দেশ প্রেমিক যুবকটিই হবে সাংবাদিক। যাঁর হাতে সমাজ ও রাষ্ট্র সব সময় নিরাপদ থাকবে। তবে এর জন্য সংবাদপত্র-টিভি চ্যানেলের পাঠক ও দর্শকদের আরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।

ভুঁইফোড় অনলাইন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝটপট সাংবাদিকতার নামে যা হচ্ছে তা মূলত সাংবাদিকতা নয়; অনেকটা অপসংবাদিকতা। এক শ্রেণির লোক অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে, কেউ সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে, কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে, প্রশাসনের দালালি করতেও এসব করে বেড়াচ্ছে।

অনলাইনের বিস্তর ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ সাংবাদিকদের এই অবাধ বিচরণ আমরা চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারবো না। তাই পাঠক-দর্শকদেরই বেছে নিতে হবে কোনটি গুজব আর কোনটি সঠিক তথ্য সংবলিত সংবাদ। পাঠকের এমন মূল্যায়ন পেলেই বেঁচে থাকবে প্রকৃত মফস্বল সাংবাদিকতা। সমাজের বুদ্ধিমান, সাহসী, শিক্ষিত ও দেশ প্রেমিক যুবকটিই হবে সাংবাদিক। সংবাদপত্র হবে সমাজের স্বচ্ছ দর্পণ।

লেখক: সাংবাদিক, আজকের পত্রিকা।